বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার ডাকাতি

04-Higueinবাংলাদেশ ব্যাংকে সাইবার ডাকাতির ঘটনায় ফিলিপাইনের সিনেট কমিটির শুনানিতে আরসিবিসি ব্যাংকের সাবেক ম্যানেজার মারিয়া সান্তোস দিগুইতো দাবি করেছেন, তিনি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী মানুষদের দাবার চাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক নিউইয়র্ক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা তদন্তে সিনেট কমিটির মঙ্গলবারের শুনানিতে এমন দাবি করেন তিনি।
স্থানীয় সময় গতকার মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে শুরু হওয়া শুনানিতে দিগুইতোর পাশাপাশি চীনা বংশোদ্ভূত কিম অংও অংশ নেন। সিনেট কমিটির প্রথম দুটি শুনানিতে দিগুইতো তার জবানবন্দি দিলেও গত ২৯ মার্চ সিনেটে কিম অং হাজির হওয়ার পর থেকে তাকে আর দেখা যায়নি। গতকাল মঙ্গলবারই প্রথমবারের মতো তারা একে অপরের মুখোমুখি হলেন। শুনানিতে আগে থেকে প্রস্তুত করে রাখা রাখা একটি বিবৃতি পড়ে শোনান দিগুইতো। তিনি সে সময অভিযোগ করে বলেন, ‘সম্প্রতি প্রভাবশালী লোকজন অর্থ পাচারের সব দায় আমার ওপর দিচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন, ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আমার মতো মাঝামাঝি পর্যায়ে থাকা কারও পক্ষে কোটি কোটি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মতো অপরাধ সংঘটিত করা সহজ ব্যাপার। সত্যি কথা বলতে গেলে বড় বড় ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ ছাড়া এ ধরনের অপরাধ হয় না। কারণ এসব ব্যবসায়ীর বিভিন্ন দেশে প্রভাব থাকে।’
নিজেকে বড় বড় ব্যবসায়ীদের দাবা খেলার গুটি হিসেবে উল্লেখ করে দিগুইতো বলেন, ‘সিনেট কমিটি যদি গ্র্যান্ড মাস্টারকে খুঁজে থাকে তবে আমি সে ব্যক্তি নই। সাধারণ একজন ব্যাংক ম্যানেজারের চেয়ে এক্ষেত্রে আরও উচ্চ পর্যায়ের মানুষদের সংশ্লিতা রয়েছে।’
দিগুইতো হলেন ফিলিপাইনের মাকাতি সিটির সেই জুপিটার স্ট্রিট শাখার সাবেক ম্যানেজার যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি হওয়া টাকাগুলো লেনদেন হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। আর দিগুইতোর বিরুদ্ধে অভিযোগ, চুরি যাওয়া অর্থগুলো জমা রাখা ও তোলার সুবিধা করতে ৫ জনের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করে দিয়েছেন তিনি। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে দিগুইতো বলেন, ‘এক্ষেত্রে কোনও ষড়যন্ত্র আছে কিনা তা তিনি জানেন না। আগের শুনানিতে দিগুইতো দাবি করেছিলেন, অং-ই তার সঙ্গে অভিযুক্ত চার ব্যাংক ডিপোজিটরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সে চারজন বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ লেনদেন করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দিগুইতো আরও বলেছিলেন, অং আরসিবিসি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও সিইও লরেঞ্জো তানের বন্ধু।
আর সর্বশেষ শুনানিতে দিগুইতোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অং। তার দাবি, তিনি কেবল শুহুয়া গাও নামে এক ডিপোজিটরকে সাবেক ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। গাও একজন ক্যাসিনো ব্যবসায়ী বলে সে সময় উল্লেখ করেন তিনি। দিগুইতো আর অং এর পাশাপাশি মঙ্গলবারের শুনানিতে সানসিটি গ্রুপ জাংকেট ও গোল্ডম্যান জাংকেট নামে দুই ক্যাসিনো কর্তৃপক্ষকেও শুনানিতে উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এছাড়া আরসিবিসি ব্যাংকের কর্মকর্তা ও প্রতিনিধি, অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কাউন্সিল, ফিলরেম সার্ভিস কর্পোরেশন, ফিলিপাইন অ্যামিউজমেন্টকে শুনানিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
গত সোমবার অং ফিলিপাইনের অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের (এএমএলসি) কাছে আরও ৮ লাখ ২৮ হাজার ৩৯২ ডলার ফেরত দেন। এর আগেও ওই অর্থের একাংশ ফেরত দিয়েছিলেন চীনা বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী কিম অং। অর্থ হস্তান্তরের সময় এএমএলসি-র নির্বাহী পরিচালক জুলিয়া বাকে-আবাদ,ফিলিপাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের র্রাদূত জন গোমেজ ও এএমএলসি-র সদস্য ইমানুয়েল এফ দুক উপস্থিত ছিলেন। জুলিয়া বাকে-আবাদ জানান, ৫০০ এবং ১০০০ পেসোর (ফিলিপাইনের মুদ্রা) নোটে ওই অর্থ ফেরত দেওয়া হয়। অং-এর আইনজীবী ভিক্টর ফার্নান্দেজ বলেন,‘ওই অর্থ গাও শুহুয়া ইস্টার্ন হাওয়াই এবং মাইডাস ক্যাসিনোতে সরিয়েছিলেন।’ তিনি আরও জানান,গাও যে অর্থ নিয়েছিলেন,আগামী ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে অং সেখান থেকে আরও ৪৫০ মিলিয়ন পেসো জমা দেবেন। এর আগে বৃহস্পতিবার ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার ফেরত দেন ব্যবসায়ী কিম অং। বৃহস্পতিবার তার আইনজীবী ইনোসেনসো ফেরারের মাধ্যমে তিনি নগদে এই অর্থ এএমএলসি-র কাছে হস্তান্তর করেন।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম হ্যাকড করে যুক্তরা্েরর ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে হ্যাকাররা ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ চুরি করে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) চারটি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে। সেখান থেকে ওই অর্থ ফিলিপিনো পেসোতে রূপান্তরের পর দুটি ক্যাসিনোতে পাঠানো হয়।

SHARE