আধুনিক কবিতার আধুনিকতা

30

-কে জি মোস্তফা-

সাহিত্যের আদি উৎস কবিতা। কবিতা প্রাণের নৈঃশব্দ্যে একটি স্পন্দিত বীজ। জীবনের যেকোনো স্বপ্ন প্রথম বীজ আকারেই মূর্ত হয় কবির উপলব্ধি আর প্রগাঢ় বিশ্বাসেরজমিতে। সে বীজটি নিঃসঙ্গ বুকের শিরা-উপশিরা ছিঁড়ে শব্দে শব্দে প্রকাশ পায় ভাষার কারুকাজে। কবিতা কখনো মোহের সন্তান, কখনো বা মোহভঙ্গের পিতামাতা।কবিতায় কী থাকে? থাকে মানুষ। থাকে সমকাল ও সমাজ, লাঞ্ছনা ও হিং¯্রতার তাড়া খাওয়া পৃথিবীটা। যে কথা একক, যে কথা শান্তির বারিতে কিংবা শোকের প্রান্তরে বসেআপনমনে ফিসফিসিয়ে বলে যেতে হয় তাই কবিতা।
যদিও দার্শনিকপ্রবর প্লেটো ‘রিপাবলিক’ থেকে কবিদের বহিষ্কার করেন এই অজুহাতে যে কবিরা মিথ্যাচারণ করে থাকে। অথচ কৌতুকের বিষয়, প্লেটো নিজেও একজনকবি। গ্রিকসমাজ থেকে শুরু করে এই বিশ্বায়নের যুগেও কবিরা সসম্মানে সগৌরবে বিরাজ করছেন। কারণ মানুষী সভ্যতায় কবিদের ভীষণ প্রয়োজন। হোমার, দান্তে,শেক্সপিয়র, গালিব, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল প্রমুখকে বাদ দিয়ে কি মানুষের কোনো অস্তিত্ব হতে পারে? শুধু সভ্যতার বিকাশে নয়, মানুষের নিজের অস্তিত্বের কথা জানারজন্যও বিশেষ করে কবিদের প্রয়োজন। কেননা কবি হলেন দ্রষ্টা। কবি একই সাথে ভূত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অবলোকন এবং অপরোক্ষ ভাবতে পারেন। সত্যি কথা বলতে কী,একজন কবিকে আবিষ্কার করার মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের আবিষ্কার করি। জীবনকে নতুন আলোকে অবলোকন করি। ফলে জীবন আমাদের কাছে নবরূপে উদ্ভাসিত হয়এবং অভিনব তাৎপর্য বহন করে নিয়ে আসে।
কিন্তু আজকের বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বায়িত এ পৃথিবী যখন প্রতিনিয়তই নানা সঙ্কট ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন, তখন কবিদের অবস্থান কোথায় ও কতটুকু? আজকের দ্রুত-উপদ্রুত, ব্যস্ত-ত্রস্ত এই গদ্যময় জীবনে কবিতার স্থান-মান, প্রয়োজন ও ভূমিকা সম্পর্কে তাই প্রশ্ন উঠতে পারে। কেউ কেউ বলেন, বিশ্বায়নের প্রবল ঢেউ কবিতাকে ঠেলেনিয়ে যাচ্ছে গভীর কোনো এক খাদের দিকে। কিন্তু সেটা সর্বাংশে সত্য নয়। কেননা কিছু মানুষের বেঁচে থাকার শর্তই হলো কবিতাচর্চা।
কবিতাচর্চা আসলে জীবনচর্চা। কবির আত্মোপলব্ধির মুহূর্ত থেকে শুরু হয় তার সংগ্রাম। কবি প্রকাশ করে জীবনের পরম চরমতা ও মানব অস্তিত্বের অতি গভীর মূলসমূহ।জীবনের অসঙ্গতি, আধুনিক জীবনের আধুনিক মানুষের আধুনিক মানসিকতার স্বরূপ ও সঙ্কট সম্পর্কে আজকের কবিদের নতুন নতুন ব্যাখ্যা। তাই তাদের কবিতাআপসহীন, ধারালো ও বাস্তববাদী। আসলে জীবনের যাবতীয় সম্ভাবনার হদিস নেয়া এবং তার সীমানা প্রসারিত করাই কবিদের উদ্দেশ্য। কবিরা কিছু শেখাবেন না, কিন্তুপ্রাণিত করবেন। মানুষকে স্পন্দিত করার এই বীজমন্ত্রটি সম্ভবত আজো কবিদের ভাবনায় অটুট।
বলা হয়ে থাকে কবিতা শিল্পের শিল্প। এক বিশিষ্ট বিদেশী সাহিত্যিক একবার বলেছিলেন, আমি গল্প-উপন্যাস লিখি পাঠক সাধারণের জন্য, প্রবন্ধ লিখি সমালোচকের জন্য,আর কবিতা নিজের জন্য। আসলে আধুনিক কবিরা যথেষ্ট শিক্ষিত। তাদের পড়াশোনার পরিধি অনেক বড়। তাদের কবিতার মধ্যে থাকে তারই প্রতিফলন, তারইঅনুরণন। এক-একটি শব্দ যেন বহুবিধ অনুষঙ্গ নিয়ে প্রকাশিত হয়। মায়াবী কোনো ডাক নেই, আছে এক প্রচ- অভিঘাত। অপর দিকে, পাঠকের হয়তো ততখানিঅনুশীলিত মন নেই। আর এই ব্যবধানের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে দুর্বোধ্যতার প্রধান কারণ। গ্রিক পুরাণের উপমা, ঐতিহাসিক ছায়াপথ, তৎসম শব্দ, লোকায়ত শব্দ,স্যুররিয়েলাস্টিক শব্দ, কিউবিক শব্দ, রূঢ় শব্দ, বিদেশী শব্দ তথা শব্দের ওজন-গতি-ব্যঞ্জনা ইত্যাদি পাঠকের মানসিক আলস্যে দুর্বোধ্যতার দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে কবিতারমিছিল থেকে যায় হারিয়ে। তবে বিষয় যাই হোক না কেন, যত মেধাবী হোক না তার প্রকাশ, কাব্যব্যঞ্জনার শেষতম ও সার্থক আবেদন হৃদয়বৃত্তির কাছে।
বলা বাহুল্য, সাদা কাগজই একজন কবির আসল মঞ্চ এবং সাদা কাগজে ব্যবহৃত শব্দাবলি হচ্ছে কবির শ্রোতা। তাই শ্রোতাদের আবিষ্ট করে রাখতে প্রয়োজন যথার্থ শব্দের।শব্দ যেহেতু একজন কবির প্রধান অস্ত্র, সেই অস্ত্রটি চালনায় অবশ্য নিপুণ হতে হয়। মানুষের মন আকাশের মতো অসীম, সাগরের মতো অতল। সীমাহীন সেই মনোরাজ্যেভাবের কত রকমের খেলা, কত বিচিত্র সব অনুভূতি! সেসব অনুভূতির সঠিক প্রকাশের জন্য চাই সঠিক শব্দ। তাই নির্দিষ্ট একটি শব্দ খুঁজতে খুঁজতে অস্থির কবিমন অজান্তেঢুকে পড়ে শব্দের অরণ্যে। প্রাকৃতিক অরণ্যে আছে বাতাসের শোঁ-শোঁ শব্দ, পাতার মর্মরধ্বনি, পাখির কূজন, ঝরনার উচ্ছলতা, মেঘের গর্জন, বিচিত্র আরো কত রকমেরধ্বনি এবং প্রতিধ্বনি! কবিতাও কখনো কখনো প্রকৃতি, বিশুদ্ধ প্রকৃতি। কবিতার ব্যাকরণ যা-ই হোক না কেন তা এই বিশ্ব, এই ব্রহ্মা- এবং এর রহস্যের চেয়ে বড় হতে পারেনা। যখন উদিত সূর্যের কিরণ থেকে স্বর বের হয়, গাছের পাতা থেকে স্বর বের হয়, জ্যোৎস্না থেকে স্বর বের হয়, যখন দিনের শুরু এবং দিনান্তের স্বর আলাদা হয়ে ফুটেওঠে, তখন সেই স্বরকে কবিতায় বসালে তা তো কাব্যময় হয়ে উঠবে। অবশ্য সবকিছু ছাপিয়ে প্রকৃতিতে বিরাজ করে এক মহানৈঃশব্দ্য। ধ্যানমগ্ন সেই নৈঃশব্দ্যইঅবিরামভাবে অঙ্কুরিত করে চলেছে বিচিত্র ধরনের শব্দমালা। আর ওই শব্দমালাই নিয়ত পল্লবিত হয়ে ওঠে আকাশে-বাতাসে-পাহাড়ে পর্বতে।
সে যাই হোক, কবির তীব্র জীবনবোধ থেকে যেহেতু কবিতার উৎসারণ, শব্দ তাই অনেকটা ফুলকির মতো এসে পড়ে কবি মনের চাপা ইন্ধনে। নিসর্গের নির্জনতার প্রভাবকিভাবে কবিকে অন্তর্মুখী করে তোলে তার একটা ছবি আঁকেন তিনি। নদী-পাহাড়-অরণ্য-সমুদ্র সবকিছুর আকর্ষণই যেহেতু কবির কাছে প্রবল। সেসব বর্ণনা করতে করতেতিনি মহনীয় হয়ে ওঠেন। বৃষ্টি, বিদ্যুৎ আর শিকড়Ñ এই তিনটি উপমা যথাক্রমে স্বস্তি, উদ্দীপনা আর নিবিড়তার প্রতীক। এসব উপমাতে-রূপকল্পে-বাগবিদ্যুতে যে কবিতার পাঠকদের জন্য যত বেশি ভালোবাসা, মমত্ববোধ প্রকাশ করতে পারেন তিনি ততই শক্তিমান। এভাবে কবি তার রচিত একটি দিগন্তের দিকে ক্রমাগত ছুটে চলেন,হয়তো আকাশ মাটির মিলন দেখবেন বলে। কিন্তু কবিতাকে এমন পর্যায়ে আনতে হলে সঙ্কেত ভেঙে গূঢ় অর্থের বিকাশ ঘটাতে হয়। তখন প্রয়োজন পড়ে দু-একটি চাবি-শব্দের। সেই চাবি-শব্দটিকে পাঠক দেখতে পায় না, তবে অনুভব করতে পারে। প্রবহমান বিশ্বের একটা সময় বা স্থান তখন পরিবর্তিত হয়ে যায়। তখন অন্তরের শব্দ আরআত্মার নৈঃশব্দ্য অবলোকনের ব্যাপ্তিতে একাকার। মনে আনে শান্তি। জীবনের উপান্তে এসে সরাজীবনের এই ব্যাপ্তিকে মনে হবে তখন ক্ষণকালের খেলা! আসলে কবিতাইহয়তো সেই সর্বগ্রাসী দুর্বলতা যা কবির আর সব সত্তাকে, অহঙ্কারকে ঢেকে দেয়। কবিকে করে তোলে পৃথিবীর সবচেয়ে বেদনার্ত ও করুণ, সবচেয়ে উদ্ধত ও শক্তিশালীমানুষ।
কিন্তু বর্তমানে কবিতার ভূমি থেকে পাঠক সরে যাচ্ছে এবং কবিতার পাঠকও তৈরি হচ্ছে না। সম্ভবত এর প্রধান কারণ প্রাচীন কাব্যের হ্যাংওভার। আগের কত কবিতাআমাদের জীবনের অংশ হয়ে আছে, তুচ্ছ জীবনের বিচিত্র সব মুহূর্তে সত্যি হয়ে উঠেছে, বন্ধু হয়ে থেকেছে। অথচ আধুনিক কবিতা যেন ঠিক আমাদের অভ্যস্ত কবিতা নয়,যেন অ্যান্টিপোয়েট্রি। আসলে কাব্য-আঙ্গিকের যে উপাদানটি আগে পাঠকের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেত, তা হলো অন্ত্যমিল ও মিলের বিচিত্র বিন্যাস। কিন্তু স্বভাব কবির দিনতো আর নেই। সরল কবিতার দিনও অন্ত্যমিল বলেই মনে হয়। আধুনিক কবিরা ছন্দের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেতে চান। এমনকি প্রবহমান গদ্যেও কেউ কেউ কবিতালিখছেন। অন্ত্যমিল না থাকলেও সেসব কবিতায় অবশ্য অন্তর্লীন ছন্দ রয়ে যায়।
রিলকে বলেছেন শব্দের মিলনদেবী খুব খামখেয়ালি। তিনি নিজের ইচ্ছেমতো আসেন-যান। আধুনিক কবিদের কাছে তিনি তো আরো অধরা। স্বেচ্ছায় না এলে তাঁকে বেঁধেআনতে হয়। সেজন্য বল প্রয়োগ না করে কবিরা তাঁকে উপেক্ষা করছেন, বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন অমিল, অসম্পূর্ণ মিল বা ধ্বনির অনুষঙ্গ।
কিন্তু আধুনিক কবিতার ছন্দহীনতা, পদের অমিল, উপমার জটিলতা, গদ্যগন্ধী কথাবার্তা, কুয়াশাচ্ছন্ন দুর্বোধ্যতা কবিতার বিরুদ্ধে এ রকম এক-একটা অবিশ্বাস দানা বেঁধেউঠেছে। অবশ্য হৃদয়সংবাদী পাঠক সবদেশে চিরকালই কম এবং কবিতা কোনোকালেই নিরঙ্কুশভাবে জনতান্ত্রিক ছিল না। বর্তমানে জনসংখ্য বাড়ছে, কবির সংখ্য বাড়ছে।কিন্তু হৃদয়সংবাদী পাঠক তুলনায় কমছে। অবশ্য সবাই যেমন কবি নয় কেউ কেউ কবি, তেমনি সবাই পাঠক নয়, কেউ কেউ পাঠক।

SHARE