স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকায় স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে নাধাইকৃষ্ণপুর গ্রাম

31

–মো. জাহাঙ্গীর আলম–

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার গোবরাতলা ইউনিয়নের নাধাইকৃষ্ণপুর গ্রাম। শহর থেকে পনের ও লোকালয় থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দুইপাশে সবুজ ধানক্ষেত পেরিয়ে সেই গ্রাম।  নাধাইকৃষ্ণপুর গ্রামের চারদিকে যতদূর চোখ যায়, দেখা মিলে শুধু সবুজ ধানক্ষেতের। সেখানে গেলে যে কারোরই মনে দোলা দিবে দক্ষিণা বাতাসে দোলতে থাকা ধানের কচি পাতাগুলোর মত। সবুজ সমারহে চারদিকে ঘেরা এই গ্রামে রয়েছে প্রায় ৭৫ পরিবারের বসবাস। যার সিংহভাগ জনগোষ্ঠীই আদিবাসী। তাদের বেশিরভাগই বঞ্চিত শিক্ষা থেকে। অনেক সমস্যার মধ্যে তাদের অন্যতম একটি সমস্যা হচ্ছে-বেশিরভাগ পরিবারের নেই স্যানিটেশন ব্যবস্থা। হাতে গোনা ১৫ থেকে ২০ টি পরিবারের যে স্যানিটেশন ব্যবস্থা রয়েছে তাও আবার স¦াস্থ্যসম্মত নয়।
স্যানিটেশন হল প্রাণীর মলমূত্র, ময়লা পানি এবং আবর্জনা পরিস্কার করার সঠিক উপায়। আর এটি নিশ্চিত করে একটি দেশের উন্নতি ও উন্নয়ন। উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা সুস্থ দেহ ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশের পরিচায়ক। শহরে এই ব্যবস্থা একটু ভাল হলেও নাধাইকৃষ্ণপুর গ্রামের এসব মানুষরা এখনো মল ত্যাগ করে খোলা জায়গায়। এ বিষয়ে কথা হয় সেই গ্রামের কয়েকজনের সাথে।
নাধাইকৃষ্ণপুর গ্রামের মধ্যবয়সী এক কৃষক শ্রী বিমল সরেন । তিনি জানান,“কিছুদিন আগে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ১৫টা ল্যাট্রিন পাওয়া যায়। বাদবাকী সব মানুষই বাইরে পায়খানা করে। আমাদের বাচ্চারাও বাড়ির পেছনে ও ফাঁকা জায়গায় পায়খানা করে। যার কারণে বাচ্চাদের ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে। আর্থিক সমস্যার জন্য আমরা ল্যাট্রিন বসাতে পারি না, আর বাইরে থেকেও কেউ আমাদের সহযোগিতা করে না। আমি ছোট থেকেই দেখে আসছি, আমাদের এই অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় না”।
স্যানিটেশনকে সেই গ্রামের সবচাইতে বড় সমস্যা উল্লেখ করে নাধাইকৃষ্ণপুর গ্রামের শ্রী দয়াল মুরারী বলেন,“মলত্যাগ করতে আমাদেরকে খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে মাঠে যেতে হয়। কারণ, সেই সময় সাধারণত মানুষজন বাইরে বের হয় না। আর দিনের বেলায় বাড়ির আশেপাশে বিভিন্ন ঝোঁপঝাড় বা জঙ্গলে মলত্যাগ করে থাকি।
মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য স্যানিটেশন খুবই জরুরি। কিন্তু স্বসাস্থ্যসম্মত পায়খানা না থাকায় নাধাইকৃষ্ণপুর গ্রামের সুন্দর পরিবেশ যেমন দূষিত হচ্ছে, তেমনই বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়তে হচ্ছে সেখানকার অধিবাসীদের। সেখানে মেয়েদের সমস্যা আরও বেশি। স্যানিটেশন নিয়ে আদিবাসী গৃহিণী শ্রী মারিয়া হে¤্রম এর সাথে কথা হলে তিনি বলেন,“দিনের বেলা মানুষ যখন মাঠে-ঘাটে কাজ করে তখন পায়খানা করাটা প্রত্যেক নারীর জন্যই অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক লজ্জাও লাগে, কিন্তু আমাদের কিছুই করার থাকে না। কারণ, প্রকৃতির ডাকে সাড়া না দিয়ে তো কারোরই উপায় নেই”।
“কোন ব্যবস্থা না থাকায়, ১ থেকে ১.৫ কিলোমিটার মাঠ পেরিয়ে গিয়ে মলত্যাগ করতে হয় বলে জানান শ্রী সীমা হে¤্রম। তিনি আরও বলেন, দিনের বেলা দূরে কোথাও যেতে না পারায়, বাড়ির পেছনে বা আশেপাশেই ফাঁকা জায়গায় প্রসাব-পায়খানা করে থাকি। যার কারণে অনেক দূগর্ন্ধ ছড়ায় এবং সবসময় জ্বর, মাথা ব্যাথাসহ বিভিন্ন অসুখ লেগেই থাকে”।
মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রত্যেকটা বাড়িতে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থা একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগড় হিসেবেও কাজ করে বলে জানান গোবরাতলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আসজাদুর রহমান মান্নু। তিনি বলেন,“আদিবাসীদের জন্য আমার অনেক কিছু করার আছে। স্যানিটেশনের ব্যাপারে একটি কর্মসূচি চলছে। এটা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আদিবাসীদের জন্য নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি। এ বছরের শেষে অথবা আগামী বছরের শুরুতে এই কার্যক্রম শুরু হবে। তাতে পর্যায়ক্রমে প্রত্যেকটা পরিবারকে স্যানিটেশন ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে”।
পরিবেশ রক্ষায় এবং সুস্থ্য ও সমৃদ্ধ ভবিষৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনার সুযোগ করে দিলে অনেকটাই উপকার হবে বলে কর্তৃপক্ষের কাছে প্রত্যাশা করেন নাধাইকৃষ্ণপুর গ্রামের স্যানিটেশন প্রত্যাশী আদিবাসী এসব মানুষরা।

ফেলো-রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম

 

 

 

 

 

 

SHARE