পরিচয় পেল বেল বাংলাদেশের প্রথম বাণিজ্যিক জাত বারি বেল-১

189

chapainawabganj pic 06-04-16 abdur rob nahidচৈত্রের দুপুরে এক গ্লাস বেলের শরবত অনেকের প্রাণ জুড়িয়ে যায়। আমাদের দেশের অনেক বাড়িতে বেলের গাছ দেখতে পাওয়া যায়, তবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বেল গাছের বাগান তৈরী করতে কেউ তেমন আগ্রহী হয় না। প্রচলিত এই বেলের কোন নামও এতদিন ছিল না, কারো গাছের বেল খেয়ে ভালো লাগলে, বলা হয় রহিমের বাড়ির বেলটা চমৎকার, উত্তর পাড়ার করিমের গাছের বেলের স্বাদ চমৎকার। তবে এবার পরিচয় পাচ্ছে বেল।
বেলের প্রথম জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। বেলের প্রথম বাণিজ্যিক জাত বারি বেল-১, উৎকৃষ্ট মানের বেলের এই জাতটি জাতীয় বীজ বোর্ড থেকে অবমুক্ত করা হয়েছে যার নিবন্ধন নং ০৪ (৩২)-০৩/১৬।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এর আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জে, স্থানীয় ২২ টি জার্মপ্লাজম নিয়ে দীর্ঘ ৯ বছরের গবেষণায় এই সাফল্য পান গবেষকরা।
আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড.শরফ উদ্দিন জানান, সারাবছর ফলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে ২০০৬ সালে সম্মিলিত উদ্যোন উন্নয়ন প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। এই প্রকল্পের আওতায় অপ্রচলিত ফলের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল।
এরই ধারাবাহিকতায় আমি ২০০৭ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থান হতে ২২ টি বেলের জার্মপ্লাজম সনাক্তকরণ করি ও পরে সায়ন সংগ্রহ করে আমাদের কেন্দ্রে জন্মানো রুটস্টকের উপর কলম করা হয় এবং গবেষণা মাঠে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ নয় বছরের গবেষণায় সেখান থেকেই পাওয়া গেল উৎকৃষ্টমানের জাতটি।
নতুন এ জাতের বৈশিষ্ট:
তিনি আরো বলেন, অতীতে বীজের গাছ থেকে জন্মানো চারাগাছ হতে ফলন পেতে ৮-১২ বছর পর্যন্ত সময় লাগতো। ফলে মানুষ বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতো না। এই জাতটি কলমের মাধ্যমে জন্মানো যাবে, যার ফলে মাতৃগাছের গুণাগুণ হুবুহু অখুন্ন থাকবে এবং ফল আসতে সময় লাগবে মাত্র ৫ (পাঁচ) বছর। ফলে অন্যান্য ফলের মতো বেলও চাষীরা বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতে পারবে।
বেলের এ জাতটির গুরুত্বপূর্ন বৈশিষ্ট্যসমুহ হলো, নিয়মিত ফলদানকারী, ফল মাঝারি আকারের, প্রতিটি ফলের গড় ওজন ৯০০ গ্রাম, কাঁচা বেলের রং সবুজ। তবে পাকা ফল দেখতে হালকা সবুজ হতে হালকা হলুদ বর্ণের।
বারি বেল-১ জাতটির ফলের খাদ্যেপযোগি অংশ ৭৮ ভাগ,এর মিষ্টতা (টিএসএস) ৩৫% ফলে শরবত তৈরীতে আলাদা ভাবে চিনি মেশানোর প্রয়োজন হয় না বলে যোগ করেন ড. মো. শরফ উদ্দিন।
তিনি আরো বলেন সাত বছর বয়সী গাছে বছরে গড় ফলের সংখ্যা ৩৮টি এবং গড় ফলন ৩৪ কেজি, অর্থাৎ হেক্টর প্রতি ফলন প্রায় ১৪ টনের মাতো। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে ফলন ও বাড়বে। এটি বেলের মধ্যম সময়ের জাত। এই জাতটির সংগ্রহের সময় মার্চ মাসের শেষ হতে এপ্রিল মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত।
রোপন পদ্ধতি:
বাংলাদেশের সকল জেলাতেই এই জাতটি চাষাবাদ করা যাবে। কলমের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করতে হবে। লাইন থেকে লাইন এবং গাছ থেকে গাছের দুরুত্ব ৫ মিটার। জুন-জুলাই মাসে নির্ধারিত গর্তে কলমের চারাটি রোপণ করতে হবে। লাগানোর পর অন্যান্য পরিচর্যা সমুহ করতে হবে। রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ তেমন লক্ষ্য করা যায় না। তবে একটি লেপিডোপটেরা পরিবারের পোকা বেলের পাতা খায়। নতুন পাতাবের হলে সাইপারমেথ্রিন, কার্বারিল, ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রুপের কীটনাশক নির্দেশিত মাত্রায় মাত্র একবার ব্যবহার করলে পোকাটির আক্রমণ থেকে বেলের পাতাকে রক্ষা করা যাবে। আশাকরা যায় অসময়ে বেলের এই জাতটি চাষাবাদ করলে দেশীয় ফলের ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হবে এবং চাষীরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।
বেলের গুনাগুন :
কাঁচা ও পাকা বেলের রয়েছে বহুবিধ ব্যবহার। পাকা বেলের শাঁস গাছ থেকে পেড়ে সরাসরি খাওয়া যায়। এছাড়াও পাকা বেলের শাঁস সরবত, জ্যাম, জেলী, চাটনি, স্কোয়াস, বেভারেজ ও বিভিন্ন ধরণের আর্য়ুবেদিক ঔষুধ তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বেলের পাতা ও ডগা সালাদ হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। বেল পুষ্টিগুনে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা বেলের শাঁসে থাকে আর্দ্রতা ৬৬.৮৯ ভাগ, কার্বোহাইড্রেট ৩০.৮৬ ভাগ, প্রোটিন ১.৭৬ ভাগ, ভিটামিন সি ৮.৬৪ মিলিগ্রাম, ভিটমিন এ (বেটাকেরোটিন) ৫২৮৭ মাইক্রোগ্রাম, শর্করা ৩০.৮৬ ভাগ, ফসফরাস ২০.৯৮ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ১২.৪৩ মিলিগ্রাম এবং লৌহ ০.৩২ মিলিগ্রাম। এমনকি বেল গাছের কান্ড হতে যে আঠা পাওয়া যায় তা গাম তৈরীতে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া বেলের রয়েছে বহুবিধ ঔষুধি গুনাগুন। পাকা বেলের সরবত কোষ্ঠকাঠিন্য দুর করে থাকে। অন্য একটি গবেষণার ফলাফল হতে দেখা গেছে, বেল হতে প্রাপ্ত তৈল ২১ প্রজাতির ব্যাকটেরিযার বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধী হিসেবে কাজ করে।

SHARE